
ঈদে বেপরোয়া ডিজিটাল প্রতারণা
- আপলোড সময় : ২৭-০৩-২০২৫ ০১:৫৫:৪৪ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৭-০৩-২০২৫ ০১:৫৫:৪৪ অপরাহ্ন


* প্রতারণার প্রধান হাতিয়ার মোবাইল ব্যাংকিং মেসেজ ও ফোনকল
* জাকাত ফিতরা, রোজায় সংকটের কথা বলে চাওয়া হচ্ছে টাকা
* ১ টাকা দানে ৭০ টাকা দানের সওয়াব বলে করা হচ্ছে প্রতারণা
* বয়স্ক বিধবা ভাতা ও উপবৃত্তির নামে ওটিপি চাওয়া হচ্ছে
* ফেসবুক আইডি হোয়াটসঅ্যাপ ইমো হ্যাক করে চাওয়া হচ্ছে টাকা
ঈদকে সামনে রেখে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ডিজিটাল প্রতারণা। কোনো বড় উৎসব ঘিরেই সক্রিয় হয় এসব অপরাধী চক্র। এসময় জাল নোট ছড়ানো, ছিনতাই, চুরির পাশাপাশি গত কয়েক বছরে যোগ হয়েছে ডিজিটাল প্রতারণা। এই ডিজিটাল প্রতারণাও আবার বদলাচ্ছে ধরন। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে প্রতারণা নতুন নয়। সঙ্গে যোগ হয়েছে ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ইমেইল ব্যবহার ও হ্যাক করে প্রতারণা। ঈদ সামনে রেখে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এসব অপরাধী চক্রের সদস্যরা।
রমজান মাস ও ধর্মীয় দুর্বলতা ব্যবহার করে প্রতারণায় জড়াতেও পিছপা হচ্ছেন না অপরাধীরা। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারকারীদের কাছে ওটিপি চাওয়া, ভুলে টাকা চলে যাওয়া, পুরস্কার জিতেছেন-প্রভৃতি বলে প্রতারণা নতুন নয়। এখন হোয়াসঅ্যাপ, ইমোও হ্যাক হচ্ছে। আবার ব্যবহারকারীর হোয়াটসঅ্যাপে পরিচিত কারও নম্বর-নাম ব্যবহার করে অর্থ সহায়তা চেয়েও প্রতারণা করছেন প্রতারকরা।
প্রতারক চক্র বছরজুড়েই এমন প্রতারণা চালায়। তবে ঈদ সামনে রেখে তা আরও বেড়েছে। চলমান রমজান, রোগী হাসপাতালে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হ্যাক করে ও আর্থিক সংকটে খেতে না পারাসহ এমন নানাবিধ সমস্যার কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে একাধিক প্রতারক চক্র। দীর্ঘদিন ধরে এমন প্রতারণা করলেও এবার ঈদ সামনে রেখে নতুন নতুন সব প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে তারা। ইসলাম ধর্মমতে, রমজান মাসে এক টাকা দান করলে ৭০ টাকা দানের সওয়াব পাওয়া যায়-ধর্মকে পুঁজি করে এমন কথা বলেও টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি।
পুলিশ বলেছে, এক সময় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওটিপি নম্বর নিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতো প্রতারকরা। সম্প্রতি অধিকাংশ গ্রাহক ওটিপির বিষয়ে অধিক সচেতন হওয়ায় বর্তমানে ওটিপি দিয়ে প্রতারণা অনেকাংশে কম। ফাঁদে ফেলে এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রতারণা চলছে বেশি। অভিনন্দন প্রিয় বিকাশ গ্রাহক! আপনি দীর্ঘদিন বিকাশের সঙ্গে থাকার জন্য ১২ হাজার টাকা বোনাস পেয়েছেন। এমন বার্তা নিয়ে একটি লিংক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে। পরে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারে অনুসন্ধানী টিম জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বিকাশ ব্যবহারকারীদের ১২ হাজার টাকা দেয়ার কোনো ঘোষণা বিকাশের পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি। বরং, ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে প্রতারণার উদ্দেশ্যে এই প্রলোভন দেখানো হয়েছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধানে আলোচিত পোস্টগুলোতে থাকা ওয়েবসাইট লিংকে প্রবেশ করলে ওপরে বিকাশের লোগো এবং ‘অভিনন্দন প্রিয় বিকাশ গ্রাহক! আপনি দীর্ঘদিন বিকাশের সাথে থাকার জন্য ১২ হাজার টাকা বোনাস পেয়েছেন।’ শীর্ষক একটি লেখা দেখতে পাওয়া যায়। এ পর্যায়ে রিউমার স্ক্যানারের অনুসন্ধানকারী বিকাশহীন একটি ফোন নম্বর দিলে লেখাটি প্রদর্শন করে, যা প্রমাণ করে এটি বিকাশের আসল পেমেন্ট পেজেই নিয়ে এসেছে। তাছাড়া এ বিষয়ে বিকাশের ডোমেইন নাম দেখেও নিশ্চিত হওয়া যায়।
একটি প্রতারক চক্র বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষকদের এমপিওভুক্তীকরণ, এমপিওভুক্ত মাদরাসায় বিশেষ বরাদ্দ, উচ্চতর স্কেল, পদোন্নতির নামে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করেছে। এসব প্রতারণা থেকে সবাইকে সাবধান থাকতে বলেছে মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতর। অধিদফতরের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কেউ কোনো ধরনের সুবিধা বা অর্থ দাবি করলেই বুঝতে হবে এটা প্রতারক চক্রের কাজ। এক্ষেত্রে দ্রুত পুলিশকে জানানোর অনুরোধ।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ডিজি প্রতিনিধি মনোনয়নে সহযোগিতা, এমপিও শিটে নাম, পদবি, জন্ম-তারিখ সংশোধন, বকেয়া প্রদান, প্রশিক্ষণে শিক্ষক-কর্মকর্তা মনোনয়ন, ইনডেক্স প্রদান, ইনডেক্স কর্তনসহ অধিদফতরের বিভিন্ন কাজ করিয়ে দেয়ার মিথ্যা আশ্বাস-প্রলোভন দেখিয়ে মাদরাসায় ফোন, ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এসএমএস, বিকাশ, রকেট, নগদসহ বিভিন্ন মাধ্যমে টাকা দাবি করছে। ইতোমধ্যে মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতরের বিভিন্ন কর্মকর্তার নামে একাধিক প্রতারক চক্র বিভিন্ন মাধ্যমে (হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কর্মকর্তার ছবি ব্যবহার করে) টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতরে কোনো কাজে টাকা দেয়ার প্রয়োজন নেই। অর্থের বিনিময়ে বা উপহারের বিনিময়ে কোনো কিছুই হওয়ার সুযোগ নেই। এমন কিছু থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান।
কল মার্জিং প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ওটিপি সংগ্রহ করে প্রতারকরা। এরপর সেই ওটিপি কাজে লাগিয়ে অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অর্থ ও তথ্য চুরি করে তারা। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বোকা বানাতে প্রথমে পরিচিত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহারে ফোনকল করে প্রতারক। এসব ফোনকলে সাধারণত বিশেষ অফারসহ নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের আস্থা অর্জন করা হয়। এরপর ফোনকলটিতে গুরুত্বপূর্ণ বা পরিচিত কোনো ব্যক্তিকে যুক্ত করার জন্য কল মার্জ করতে বলা হয়। কল মার্জ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ওটিপি নম্বর শোনা যায়। প্রতারকরা ফোনকলে যুক্ত থাকায় ওটিপি নম্বরটি তারাও শুনতে পান। ফলে ওটিপি নম্বরটি কাজে লাগিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পাশাপাশি অর্থ ও তথ্য চুরি করে প্রতারকরা।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসক, উচ্চপদস্থ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারাই মূলত এ ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। কারণ, তাদের পরিচিতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা কাজে লাগিয়ে প্রতারকেরা আরও বেশি মানুষকে ফাঁদে ফেলতে পারে। কল মার্জিং প্রতারণা থেকে নিরাপদ থাকতে অপরিচিত নম্বর থেকে কোনো ব্যক্তি কল মার্জ করার অনুরোধ করলে সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনে আলাদাভাবে দুই ব্যক্তিকে ফোন করা যেতে পারে। এছাড়া অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোনকল এড়িয়ে চলার পাশাপাশি সন্দেহজনক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রয়োজনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা ফোন নম্বর ব্যবহার করতে হবে।
সহকারি অ্যাটর্নি জেনারেল ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, কোনো ওটিপি কিংবা কোনো কোড কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। তাহলে কেউ টাকা খোয়াবেন না। সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) ইনামুল হক সাগর বলেন, ৯৯৯ থেকে কখনোই কোনো ব্যক্তির মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের (বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) পিন নম্বর অথবা ব্যাংকের ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের পিন নম্বর জানতে চাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ৯৯৯ নাগরিকদের চাহিদা অনুযায়ী জরুরি মুহূর্তে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেয়। মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ও ব্যাংকের কার্ডের পিন নম্বর কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না। এ ধরনের প্রতারক চক্র থেকে সতর্ক থাকা ও তাদের সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট থানা বা ৯৯৯ নম্বরে জানাতে জনগণকে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
ডিএমপি ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার (ডিসি) বলেন, আমরা প্রতিদিনই বিকাশসহ অন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতারণার শিকার গ্রাহকদের অভিযোগ পাচ্ছি। এসব অ্যাকাউন্ট যে হ্যাক হয়েছে শুধু তা নয়, সেই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। দেশের প্রতিটি প্রান্তেই এমন প্রতারণা হচ্ছে। তবে অভিযোগের শতকরা প্রায় ৯৯ শতাংশ আমরা ডিটেক্ট করতে পারি।
সিআইডি সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ইদানীং মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণা বেড়েছে। তবে এসব প্রতারণার আগের একটি ধাপ হলো ‘ইনভেস্টমেন্ট অ্যাপস’। এই পদ্ধতিতে স্ক্যাম করছে প্রতারক চক্র। বিদেশ থেকে বাংলাদেশের সিম দিয়ে টেলিগ্রাম কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে এই স্ক্যাম করা হচ্ছে। এই অ্যাপসে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য দিয়ে কিছু ইনভেস্টমেন্ট করতে হয়, এর কিছুদিন পর লভ্যাংশ জমা হতে থাকে। গ্রাহক তখন বিকাশ বা অন্য কোনো অ্যাকাউন্ট দিয়ে টাকা তুলতে পারে। এরপর বেশি লাভের আশায় বেশি ইনভেস্টের পর লাখ টাকা বা এর বেশি জমা হলেই প্রতারক চক্র ওই ব্যক্তির অ্যাকাউন্টটি তখন ব্লক করে দেয়। মানুষের সচেতনতার অভাব রয়েছে উল্লেখ করে সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, নিজের কাছে থাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কোনো তথ্য কিংবা ওটিপি কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়। এছাড়া লাভের আশায় কোনো জায়গায় ইনভেস্টমেন্ট করা উচিত নয়। কারণ এগুলো সবই স্ক্যাম।
বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশন্স শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, প্রতারক চক্র কৌশলে কথার ফাঁদে ফেলে কিছু সংখ্যক গ্রাহককে বোকা বানিয়ে কিংবা ভয়-ভীতি দেখিয়ে প্রতারণা করার প্রচেষ্টা চালায়। আমরা এ বিষয়ে গ্রাহকদের সব সময় সচেতন থাকতে বলি। কোনো অবস্থায়ই গ্রাহক যাতে পিন, ওটিপি কারও সঙ্গে শেয়ার না করেন সে পরামর্শ দেই। এছাড়া, বিকাশ গ্রাহকদের প্রতারণা এড়াতে সারাবছরই সব মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ